
সাধারণত শৈশবেই শিশুরা কুরআন হিফয সম্পন্ন করে থাকে। ফলে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন হাফেযের জন্য পরবর্তীতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা কিছুটা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। পক্ষান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি একজন সাধারণ শিক্ষার্থী নতুনভাবে কুরআন হিফয সম্পন্ন করবে—এমন দৃষ্টান্ত বিরল। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মেধাবী প্রজেক্টে থাকা এমন বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর গল্প থাকছে এখানে।
শিক্ষকের উৎসাহে হিফযের সূচনা
সাত-আট মাস আগের কথা। একদিন ফজরের নামাযে ইমামতি করেন আলি হাসান। তার সুমধুর তিলাওয়াত সেদিন অনেকেরই মন কাড়ে। নামায শেষে একাধিক শিক্ষক উৎসাহ দিয়ে বলেন, ‘বাহ, আপনার কণ্ঠ তো বেশ সুন্দর। হিফয করার কথা ভাবতে পারেন।’
প্রশংসা ভালো লাগলেও তখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেননি হাসান। একে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার চাপ, তার ওপর মেধাবী প্রজেক্টের অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য সময় বের করাও চ্যালেঞ্জিং। সব মিলিয়ে দ্বিধায় ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের এই শিক্ষার্থী।
হিফয শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে এই তরুণ বলেন, “আমার ফ্লোর ইনচার্জ স্যার মাঝেমধ্যেই আমাকে উৎসাহ দিতেন। একসময় সাহস করে শুরু করি। কারণ, মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ‘কুরআন আমি সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য।’ ফলে বিশ্বাস ছিল, আমিও পারব।”
আলি হাসান এখন দুই পারার হাফেয। ৩০ ও ২৯ পারার মুখস্থ অংশ শিক্ষকদের শুনিয়েছেন। হাফেয হওয়ার ইচ্ছা কি ছোটবেলা থেকেই ছিল? প্রশ্নটি শুনে একটু আপ্লুত হন তিনি। এরপর বলেন, “আমার কিছু বড় সূরা মুখস্থ ছিল। তখন বাটন ফোনে দিনে ৭-৮ ঘণ্টাও কুরআন শুনতাম। মনে হতো, ইশ, আরও বেশি সূরা মুখস্থ থাকলে যখন-তখন নিজেই তিলাওয়াত করতে পারতাম!”
হিফযের এই যাত্রায় হলের দায়িত্বশীলদের সহযোগিতাও মুগ্ধ করেছে তাকে। নিয়মিত অনুশীলনের খোঁজ নিতেন শিক্ষকরা। খোঁজ রাখতেন তার অগ্রগতিরও। তবে তাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে বন্ধুরা। বন্ধুদের দুআ তাকে বিশেষভাবে ছুঁয়ে গেছে।
হিফযের খবর দিয়ে মা-বাবাকে চমকে দিতে চেয়েছিলেন আলি হাসান। কিন্তু শিক্ষক আগেই তাদের জানিয়ে দেওয়ায় সেই চমক আর দেওয়া হয়নি। তবে ছেলের এই উদ্যোগে মা-বাবা অত্যন্ত আনন্দিত।
বর্তমানে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন হাসান। তার স্বপ্ন, মেধাবী প্রজেক্টের আবাসন ছাড়ার আগেই ৩০ পারার হাফেয হয়ে উঠবেন তিনি।
হাফেয হতে চান বাংলার বিভাগের এই শিক্ষার্থী
‘বাংলা বিভাগে পড়েও আবার এসব সম্ভব! ধরে রাখতে পারবি তো?’ রবিউল হাসানকে প্রায়ই এমন প্রশ্ন করতেন তার সহপাঠীরা। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন, সুন্নাহ মোতাবেক জীবন যাপন করেন। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে কুরআন হিফযের ইচ্ছা। বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে যেন একটু বেমানান। তাদের অনেকের ধারণা, এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা শুধুই সাহিত্য চর্চা করবে। চাল-চলনে হবে তথাকথিত আধুনিক। তবে এসব মন্তব্য হাসিমুখেই সামলান রবিউল। নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চাইলে এসব ভেবে বসে থাকলে তো চলবে না।
এই তরুণ বলেন, “আমি তখন সম্ভবত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবারকে জানিয়েছিলাম, হাফেয হতে চাই। তারা বলেন, সব বাদ দিয়ে এখন হাফেয হতে গেলে নিয়মিত পড়াশোনায় ব্যাঘাত হবে। সাধারণ পড়াশোনা চালিয়ে যাও। এর পাশাপাশি সময় বের করে শিখতে পারলে শিখবে।”
এরপর নিজে নিজেই একটু একটু করে আরবি শেখার চেষ্টা করেছেন রবিউল। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে হিফয করার সুযোগ হয়নি। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন পরিচালিত ছাত্রাবাসে আসার পর কয়েকজনকে হিফয করতে দেখে তিনিও অনুপ্রাণিত হন। আবারও প্রবল হয় সেই স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছা। একসময় নিজের আগ্রহের কথা জানান দায়িত্বে থাকা শিক্ষককে।
শিক্ষকদের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, নিজের সাধ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে পড়ার চেষ্টা করেছেন। ফলে তেমন কঠিন মনে হয়নি। তবে যেদিন প্রথম পারা হিফয সম্পন্ন করেন, সেদিন বেশ আবেগপ্রবণ হয়েছিলেন।
ইতোমধ্যে প্রায় দুই পারা মুখস্থ করেছেন রবিউল। এই ছাত্রাবাসে ওঠার আগে সময়ের অনেক অপচয় হতো জানিয়ে তিনি বলেন, “এখানে সবকিছু সময়মতো হয়। হিফযের জন্য সময় বের করা তাই সহজ।”
এই তরুণ স্বপ্ন দেখেন, ধীরে ধীরে হিফয করেই একদিন হাফেয হবেন তিনি।
ডিগ্রী তো হবেই, তুই আগে শুনানি শেষ কর
মারজুকুল হাসানের গল্পটা একটু আলাদা। মা-বাবা চাইতেন, তাদের সন্তান হাফেয হবেন। মারজুকুলও হেঁটেছেন সে পথেই। মাদরাসায় ভর্তি হয়ে মুখস্থ করেছেন ৩০ পারা কুরআন। কিন্তু এরপরই হয় কিছুটা ছন্দপতন। শুনানি না দিয়েই হিফয পর্বের ইতি টানেন তিনি। হাফেয হওয়ার স্বপ্নটা থেকে যায় অসম্পূর্ণ।
পরবর্তীতে কৃতিত্বের সঙ্গে দাখিল-আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মারজুকুল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার আগে এই তরুণ প্রতিজ্ঞা করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সুযোগ পেলেই কেবল আবার শুরু করবেন হিফয, নইলে নয়।
ঢাবিতে সুযোগ না পেলেও জবিতে ভর্তির সুযোগ পান মারজুকুল। যথারীতি পড়াশোনা চলতে থাকে। ‘মেধাবী প্রজেক্ট’-এর দায়িত্বশীলরা মারজুকুলের গল্প জানতেন। তাই মাঝেমধ্যেই চেষ্টা করতেন, এই শিক্ষার্থী যেন আবার কুরআন হিফয শুরু করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে একটু ইতস্তত করেন এই তরুণ। একপর্যায়ে বলেন, “ফ্লোর ইনচার্জ স্যার আমাকে উৎসাহ দিতেন। প্রায়ই বলতেন, ‘ইয়াদ শুরু করেন। আগামীবার আপনি আমাদের তারাবী পড়াবেন।’ এসব কথা আমার মধ্যে আবার আগ্রহ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।”
বর্তমানে প্রায় পাঁচ পারা শুনানি দিয়েছেন এই শিক্ষার্থী। পুরো শুনানি শেষ হলে পরিবার নিশ্চয়ই খুশি হবে? প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলেন মারজুকুল। বলেন, “তারা তো অনেক খুশি হবে। এখন সুযোগ পেলেই বলে, ডিগ্রি তো হবেই, তুই আগে শুনানি শেষ কর।”