


আস-সুন্নাহ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট থেকে পছন্দসই কোর্স করে দক্ষ হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কেউ চাকরি শুরু করেছেন, কেউ খুঁজছেন। আবার অনেকে গুছিয়ে নিয়েছেন বড় উদ্যোক্তা হওয়ার রসদ। কিন্তু অর্জিত দক্ষতাকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানো, নিজের পরিচিতি তৈরি করা এবং পেশাগতভাবে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও দিকনির্দেশনা। সেই লক্ষ্যেই রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো ‘আস-সুন্নাহ ক্যারিয়ার সামিট-২০২৬’।
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মিলনায়তনে দিনব্যাপী আয়োজনে অংশ নেন আস-সুন্নাহ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন কোর্সের বর্তমান শিক্ষার্থী, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অ্যালামনাই এবং প্রশিক্ষকেরা। তাদের অংশগ্রহণে সামিটটি পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
সামিটজুড়ে ছিল নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ। মার্কেটিং ও উদ্ভাবন, সেলফ-ব্র্যান্ডিং ও ডিজিটাল উপস্থিতি, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, পেশাগত ক্যারিয়ার প্রস্তুতি এবং ইন্টারভিউ কৌশলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশের অভিজ্ঞ পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও করপোরেট বিশেষজ্ঞরা প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা দেন। সেশন পরিচালনা করেন এএসআইএক্স (ASIX)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ ইকবাল, লাইফ ও বিজনেস কোচ জাভেদ পারভেজ, স্টারকম বাংলাদেশ (Starcom Bangladesh)-এর গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মদ সারওয়ার বিন আনিস, টু সেন্টস পডকাস্ট (2 Cents Podcast)-এর নাফিস সালিমসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব তুলে ধরে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সাব্বির আহমাদ বলেন, “আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা। তাদের অনেকেরই এ ধরনের মানসম্পন্ন প্রফেশনাল সেশন ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ খুবই সীমিত। আমরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের যে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছি, এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই দক্ষতাকে আরও সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী করে তুলতে চাই।”
প্রশিক্ষণই যেন তার সামনে সাফল্যের নতুন নতুন দুয়ার খুলে দেয়—এ বিষয়টিও উঠে আসে আলোচনায়। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের যোগাযোগ ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ফারিদ উদ্দিন খান বলেন, “আমরা চাই, একজন শিক্ষার্থী শুধু একটি কোর্স শেষ করেই থেমে না থাকুক, বরং তার জন্য একটি শক্তিশালী পেশাগত নেটওয়ার্ক, মেন্টরশিপ এবং পরবর্তী পর্যায়ের শেখার সুযোগ তৈরি হোক। আজকের সামিট সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ ধরনের উদ্যোগ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।”
উল্লেখ্য, আস-সুন্নাহ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট ২০২৪ সালে প্রায় ১৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ২ হাজার ১৭৯ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা পরবর্তী এক বছরে, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪২ কোটি টাকা আয় করেছেন। প্রশিক্ষণ থেকে কর্মসংস্থান, আর কর্মসংস্থান থেকে আয়ের পথ তৈরির এই সাফল্য এই খাতের অর্জন হিসেবে যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনই গর্বেরও বটে।

সাধারণত শৈশবেই শিশুরা কুরআন হিফয সম্পন্ন করে থাকে। ফলে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন হাফেযের জন্য পরবর্তীতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা কিছুটা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। পক্ষান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি একজন সাধারণ শিক্ষার্থী নতুনভাবে কুরআন হিফয সম্পন্ন করবে—এমন দৃষ্টান্ত বিরল। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মেধাবী প্রজেক্টে থাকা এমন বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর গল্প থাকছে এখানে।
শিক্ষকের উৎসাহে হিফযের সূচনা
সাত-আট মাস আগের কথা। একদিন ফজরের নামাযে ইমামতি করেন আলি হাসান। তার সুমধুর তিলাওয়াত সেদিন অনেকেরই মন কাড়ে। নামায শেষে একাধিক শিক্ষক উৎসাহ দিয়ে বলেন, ‘বাহ, আপনার কণ্ঠ তো বেশ সুন্দর। হিফয করার কথা ভাবতে পারেন।’
প্রশংসা ভালো লাগলেও তখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেননি হাসান। একে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার চাপ, তার ওপর মেধাবী প্রজেক্টের অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য সময় বের করাও চ্যালেঞ্জিং। সব মিলিয়ে দ্বিধায় ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের এই শিক্ষার্থী।
হিফয শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে এই তরুণ বলেন, “আমার ফ্লোর ইনচার্জ স্যার মাঝেমধ্যেই আমাকে উৎসাহ দিতেন। একসময় সাহস করে শুরু করি। কারণ, মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ‘কুরআন আমি সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য।’ ফলে বিশ্বাস ছিল, আমিও পারব।”
আলি হাসান এখন দুই পারার হাফেয। ৩০ ও ২৯ পারার মুখস্থ অংশ শিক্ষকদের শুনিয়েছেন। হাফেয হওয়ার ইচ্ছা কি ছোটবেলা থেকেই ছিল? প্রশ্নটি শুনে একটু আপ্লুত হন তিনি। এরপর বলেন, “আমার কিছু বড় সূরা মুখস্থ ছিল। তখন বাটন ফোনে দিনে ৭-৮ ঘণ্টাও কুরআন শুনতাম। মনে হতো, ইশ, আরও বেশি সূরা মুখস্থ থাকলে যখন-তখন নিজেই তিলাওয়াত করতে পারতাম!”
হিফযের এই যাত্রায় হলের দায়িত্বশীলদের সহযোগিতাও মুগ্ধ করেছে তাকে। নিয়মিত অনুশীলনের খোঁজ নিতেন শিক্ষকরা। খোঁজ রাখতেন তার অগ্রগতিরও। তবে তাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে বন্ধুরা। বন্ধুদের দুআ তাকে বিশেষভাবে ছুঁয়ে গেছে।
হিফযের খবর দিয়ে মা-বাবাকে চমকে দিতে চেয়েছিলেন আলি হাসান। কিন্তু শিক্ষক আগেই তাদের জানিয়ে দেওয়ায় সেই চমক আর দেওয়া হয়নি। তবে ছেলের এই উদ্যোগে মা-বাবা অত্যন্ত আনন্দিত।
বর্তমানে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন হাসান। তার স্বপ্ন, মেধাবী প্রজেক্টের আবাসন ছাড়ার আগেই ৩০ পারার হাফেয হয়ে উঠবেন তিনি।
হাফেয হতে চান বাংলার বিভাগের এই শিক্ষার্থী
‘বাংলা বিভাগে পড়েও আবার এসব সম্ভব! ধরে রাখতে পারবি তো?’ রবিউল হাসানকে প্রায়ই এমন প্রশ্ন করতেন তার সহপাঠীরা। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন, সুন্নাহ মোতাবেক জীবন যাপন করেন। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে কুরআন হিফযের ইচ্ছা। বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে যেন একটু বেমানান। তাদের অনেকের ধারণা, এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা শুধুই সাহিত্য চর্চা করবে। চাল-চলনে হবে তথাকথিত আধুনিক। তবে এসব মন্তব্য হাসিমুখেই সামলান রবিউল। নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চাইলে এসব ভেবে বসে থাকলে তো চলবে না।
এই তরুণ বলেন, “আমি তখন সম্ভবত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবারকে জানিয়েছিলাম, হাফেয হতে চাই। তারা বলেন, সব বাদ দিয়ে এখন হাফেয হতে গেলে নিয়মিত পড়াশোনায় ব্যাঘাত হবে। সাধারণ পড়াশোনা চালিয়ে যাও। এর পাশাপাশি সময় বের করে শিখতে পারলে শিখবে।”
এরপর নিজে নিজেই একটু একটু করে আরবি শেখার চেষ্টা করেছেন রবিউল। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে হিফয করার সুযোগ হয়নি। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন পরিচালিত ছাত্রাবাসে আসার পর কয়েকজনকে হিফয করতে দেখে তিনিও অনুপ্রাণিত হন। আবারও প্রবল হয় সেই স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছা। একসময় নিজের আগ্রহের কথা জানান দায়িত্বে থাকা শিক্ষককে।
শিক্ষকদের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, নিজের সাধ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে পড়ার চেষ্টা করেছেন। ফলে তেমন কঠিন মনে হয়নি। তবে যেদিন প্রথম পারা হিফয সম্পন্ন করেন, সেদিন বেশ আবেগপ্রবণ হয়েছিলেন।
ইতোমধ্যে প্রায় দুই পারা মুখস্থ করেছেন রবিউল। এই ছাত্রাবাসে ওঠার আগে সময়ের অনেক অপচয় হতো জানিয়ে তিনি বলেন, “এখানে সবকিছু সময়মতো হয়। হিফযের জন্য সময় বের করা তাই সহজ।”
এই তরুণ স্বপ্ন দেখেন, ধীরে ধীরে হিফয করেই একদিন হাফেয হবেন তিনি।
ডিগ্রী তো হবেই, তুই আগে শুনানি শেষ কর
মারজুকুল হাসানের গল্পটা একটু আলাদা। মা-বাবা চাইতেন, তাদের সন্তান হাফেয হবেন। মারজুকুলও হেঁটেছেন সে পথেই। মাদরাসায় ভর্তি হয়ে মুখস্থ করেছেন ৩০ পারা কুরআন। কিন্তু এরপরই হয় কিছুটা ছন্দপতন। শুনানি না দিয়েই হিফয পর্বের ইতি টানেন তিনি। হাফেয হওয়ার স্বপ্নটা থেকে যায় অসম্পূর্ণ।
পরবর্তীতে কৃতিত্বের সঙ্গে দাখিল-আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মারজুকুল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার আগে এই তরুণ প্রতিজ্ঞা করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সুযোগ পেলেই কেবল আবার শুরু করবেন হিফয, নইলে নয়।
ঢাবিতে সুযোগ না পেলেও জবিতে ভর্তির সুযোগ পান মারজুকুল। যথারীতি পড়াশোনা চলতে থাকে। ‘মেধাবী প্রজেক্ট’-এর দায়িত্বশীলরা মারজুকুলের গল্প জানতেন। তাই মাঝেমধ্যেই চেষ্টা করতেন, এই শিক্ষার্থী যেন আবার কুরআন হিফয শুরু করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে একটু ইতস্তত করেন এই তরুণ। একপর্যায়ে বলেন, “ফ্লোর ইনচার্জ স্যার আমাকে উৎসাহ দিতেন। প্রায়ই বলতেন, ‘ইয়াদ শুরু করেন। আগামীবার আপনি আমাদের তারাবী পড়াবেন।’ এসব কথা আমার মধ্যে আবার আগ্রহ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।”
বর্তমানে প্রায় পাঁচ পারা শুনানি দিয়েছেন এই শিক্ষার্থী। পুরো শুনানি শেষ হলে পরিবার নিশ্চয়ই খুশি হবে? প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলেন মারজুকুল। বলেন, “তারা তো অনেক খুশি হবে। এখন সুযোগ পেলেই বলে, ডিগ্রি তো হবেই, তুই আগে শুনানি শেষ কর।”